সঞ্চয় আমাদের মূল লক্ষ্য, দারিদ্র দূরীকরণ আমাদের স্বপ্ন

নাগরী খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড এর সূচনালগ্নের কিছু কথা

৫০ এর দশকে এদেশের খ্রীষ্টিয় সমাজে সাধারণ খ্রীষ্টভক্তদের আর্থিক অবস্থা বর্তমান সময়ের তুলনায় স্বচ্ছল ছিল না। ঐ সময়ে খ্রীষ্টভক্তদের জমানো টাকা পয়সা নিরাপদে রাখার কোন ব্যবস্থাই ছিল না। গরীব ও অসচ্ছলদের বিপদে- আপদে যেতে হত সুদখোর মহাজনদের কাছে। মহাজনেরা টাকা ধার দিতেন ঠিকই তবে তা জমি বন্ধক রেখে। সেই আসল টাকা চক্রবৃদ্ধিহারে এতো বেড়ে যেত যে তা পরিশোধ করা সম্ভব হত না। এভাবে খ্রীষ্টভক্ত পরিবারগুলো জমি হারাতো, নিঃস্ব হত।

খ্রীষ্টভক্তদের এসব সমস্যা থেকে উত্তোরণের জন্য এদেশে কাথলিক মন্ডলীর প্রধান আর্চবিশপ ও পুরোহিতরাসবসময় চিন্তা করতো। খ্রীষ্টভক্তদের আর্থিক স্বচ্ছলতা আনায়ন বা স্বাবলম্বী করার জন্য চিন্তা ভাবনা চল্ছিল। তৎকালীন ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের আর্চবিশপ লরেন্স এল গ্রেনার, সিএসসি ‘র স্বপ্ন ছিল খ্রীষ্টভক্তদের জন্য কিছু করার।

১৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দে আমেরিকান মিশনারী ফাদার চার্লস জে ইয়াং, সিএসসি কে পাঠানো হয় কানাডায় সমবায় বিষয়ে ধারণা নেয়ার জন্য। ফাদার ইয়াং ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন দি খ্রীষ্টিয়ান কো অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন অব ঢাকা। সেই থেকে শুরু সাধারণ খ্রীষ্টভক্তদের জীবন মানের উন্নয়ন ও সঞ্চয়ী মনোভাবাপন্ন করার প্রচেষ্টা। সাথে যুক্ত হলেন নাগরীর সেন্ট নিকোলাস হাই স্কুলের শিক্ষক নাইট ভিনসেন্ট রড্রিক্স বা ভিনসেন্ট স্যার। এভাবে বিভিন্ন প্রচেষ্টার ফলে ক্রেডিট ইউনিয়ন আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

IMG_1388

তখন দেশের অবস্থা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ছিল শোচনীয়। নমস্য আর্চবিশপ লরেন্স এল গ্রেনার, সিএসসি মহোদয় এক ফরমান জারী করলেন, কোন পাল-পুরোহিত কাহারও টাকা পয়সা বা মূল্যবান কোন জিনিস পালক ভবনে গচ্ছিত বা জমা রাখতে পারবেন না। কারণ কয়েকবার বিভিন্ন ধর্মপল্লীর পালক ভবনে চুরি হওয়াতে অনেক পাল পুরোহিতকে ক্ষতির সন্মুখীন হতে হয়েছে। পূর্বেপাল-পুরোহিত টাকা পয়সা বা মূল্যবান কোন জিনিস পালক ভবনে গচ্ছিত বা জমা রাখতেন। এছাড়া পাল পুরোহিত খ্রীষ্টভক্তদেরআপদে-বিপদে বিনা সুদে টাকা ধার দিতেন। এ ধারের টাকা অনেক সময় ফেরত পেতেন না। তাই আর্চবিশপ মহোদয় এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
তখন গ্রামদেশে টাকা পয়সা নিরাপদে রাখার কোন ব্যবস্থাই ছিল না। গরীবদের আপদে-বিপদে যেতে হত সুদখোর মহাজনদের কাছে। তারা মোটা টাকা ধার দিতেন জমি বন্ধক রেখে। ফলে মহাজনের মূলধন চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে গরীবের জমি মহাজনের কাছে চলে যেত। ধর্মযাজকগণ শুধু ধর্ম প্রচারই করতেন না, ভক্তজনগণের অর্থনৈতিক উন্নতির কথাও চিন্তা করতেন। আরো চিন্তা করতেন সুদখোর মহাজনের হাত হতে গরীবদের কি ভাবে রক্ষা করা যায়। বিকল্প ব্যবস্থা অবশ্যই দরকার। তাই আর্চবিশপ মহোদয় ফাদার চার্লস জে ইয়াং, সিএসসিকে ঐ সময় কানাডায় পাঠালেন সমবায়ের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য।

ইতোমধ্যে ভারত থেকে একজন ফাদার এসে পুরানো ঢাকার সেন্ট গ্রেগরীস হাই স্কুল হলে এক সভায় সমবায়ের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে বুঝানোর চেষ্টা করলেন। তার পরামর্শ নাগরী সেন্ট নিকোলাস হাই স্কুরের শিক্ষক ভিনসেন্ট রড্রিক্স স্যারের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়াতে তিনি জোড় আপত্তি জানালেন। ফাদার ভিনসেন্ট রড্রিক্স স্যারকে বুঝাইতে না পেরে বললেন সমবায় আরম্ভ না করলে বুঝবেননা। ভিনসেন্ট রড্রিক্স স্যার বাড়ী ফিরে চুপ করে বসে রইলেন। কিছুদিন পর তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে পানজোরা কনভেন্টের তৎকালীন সিস্টার ফ্লেয়ারের (এসএমআরএ) স্মরণাপন্ন হলেন। দুইজনে মিলে পরামর্শ করলেন- গরীবদের জন্য কি করা যায়!
তারা স্থির করলেন নরম মনা মহিলাদের নিয়ে একটি ভোগ্যপণ্য সমবায় সমিতি গঠন করবেন। পর পর কয়েকটি সভাও করলেন। প্রথম সভায় লোকবেশী হয় নাই, পরবর্তী সভাগুলোতে লোকসংখ্যা বেড়ে গেল ও তারা উৎসাহিত হলেন। সভায় স্থির করলেন প্রতি মাসে মহিলারা যে যা পারে সমিতিতে জমা দিবে। এইভাবে মূলধন বৃদ্ধি পেলে ঐ টাকা দিয়ে কাপড় কিনে কনভেন্ট প্রাঙ্গণে বিক্রয় করা হবে। বছর শেষে প্রত্যেককে লাভের অংশ দেয়া হবে। তবে প্রথম কয়েক বছর লাভের টাকা হাতে দেয়া হবে না, তাদের বইতে তা লেখা থাকবে। এইভাবে মূলধন বাড়ানো হবে।

যারা উপস্থিত ছিল প্রত্যেকেই এই প্রস্তাবে রাজী হল, পরবর্তী সভার স্থান ঠিক করা হল পানজোড়া কনভেন্ট প্রাঙ্গণ। পরবর্তী সভায়যথা সময়ে সকলে হাজির। আলাপ আলোচনা শুরু, টাকা পয়সা জমা নেয়া হচ্ছে। ঠিক এমন সময় নমস্য ফাদার চার্লস জে, ইয়াং, সিএসসি মঠবাড়ী হতে এসে সভায় উপস্থিত। সকলে চমকিয়ে উঠলো, উনি আবার কে ? কারণ উনি যে আসবেন তা কেহই জানতো না। নীরবে বসে উনি সকলের আলাপ আলোচনা শুনলেন। সবশেষে তিনি কিছু বলার অনুমতি নিয়ে বলতে শুরু করলেন। ফাদার চার্লস জে, ইয়াং, সিএসসি এর বক্তব্যের সার কথা ছিল এই সময় এই অঞ্চলে ভোগ্যপণ্য সমবায় মানুষের উপকারে আসবে না, সকলের জন্য দরকার ঋণদান সমবায় সমিতি। তিনি উপস্থিত সবাইকে চিন্তা করতে বলে ঐদিনের মত তিনি পাল পুরোহিতের বাসভবনে চলে গেলেন। তিনি পাল পুরোহিতকে সমবায় সমিতির উপকারীতা বুঝাতে সক্ষম হলেন। পরবর্তী রবিবার পাল পুরোহিত ফাদার গেডার্ড, সিএসসি মহোদয়খ্রীষ্টযাগের পর ঘোষণা করলেন ফাদার ইয়াং আবার কোন একটি নির্দিষ্ট তারিখে নাগরীতে আসবেন। ঐ দিন ধর্মপল্লীর সকল পুরুষ ও মহিলারা যেন উপস্থিত থেকে ফাদার চার্লস জে, ইয়াং, সিএসসি এর বক্তব্য শুনেন, মিটিং হবে গির্জা প্রাঙ্গণে। নির্দিষ্ট তারিখে, নির্দিষ্ট স্থানে লোকজন উপস্থিত হইলো। মহিলাগণ এ ব্যাপারে আগেই শুনেছিল, পুরুষেরা চিন্তায় পড়ে গেল। ফাদার ঐ দিনের সভায় ঠিক করলেন, কখন, কোথায়, কোনদিন ঋণদান সমিতির গোড়াপত্তন করবেন। ঐ দিন সকলে যেন শেয়ার বাবদ আট আনা (পঞ্চাশ পয়সা) ও সঞ্চয়ের জন্য আট আনা(পঞ্চাশ পয়সা) নিয়ে আসে। ১৯৬২ খ্রীষ্টাব্দের ২৮ শে আগস্ট সকলে মিলিত হল। ফাদার ইয়াং ঢাকা থেকে সমবায় ঋণদান সমিতির জন্য কিছু পাশ বই, জমার বই নিয়ে এসেছিলেন। তিনি ৯ জনকে বোর্ড অব ডিরেক্টর, ২ জনকে পর্যবেক্ষণ কমিটি ও ৩ জনকে ঋণদান কমিটির সদস্য, সর্বমোট ১৪ জনকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্ব দিয়ে গেলেন। বোর্ড সদস্যদের সাথে সভা করে কাজ  বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন এবং সপ্তাহে যা কিছু আদায় হবে তা পাল পুরোহিতের নিকট জমা রাখতে বলে গেলেন। এই ভাবে শুরু হয় পথ চলা নাগরী খ্রীষ্টান সমবায় ঋণদান সমিতির বা নাগরী খ্রীষ্টান কো অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড এর পথ চলা যা এখনও অব্যাহত আছে। গত ২৫ শে ফেব্রæয়ারী, ২০২১ খ্রীষ্টাব্দে নাগরী ইউনিয়নের নাগরী গ্রামের নিজ বাড়ীতে বেলা ১১ টায় ১৯৬২ খ্রীষ্টাব্দে স্থাপিত নাগরী খ্রীষ্টান কো অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড এর ১ম সেক্রেটারী মিসেস মেরী রোজারিও একান্ত সাক্ষাতকারেদি কো অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ (কাল্ব) এর মুখপত্র ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’ এর নির্বাহী সম্পাদক মি: এলড্রিক বিশ^াস কে বলেন-  ১৯৬২ খ্রীষ্টাব্দে তখন পানজোরা গার্লস প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করি। নিজের আগ্রহে ক্রেডিট ইউনিয়ন বা সমিতি গঠনের সভায় যোগদান করি। সেই সভায় আমার নাম প্রস্তাব হয় সেক্রেটারী পদের জন্য এবং নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করি নাইট ভিনসেন্ট স্যারের সার্বিক সহযোগিতায়। সূচনালগ্নে সমিতির নাম ছিল নাগরী খ্রীষ্টান ঋণদান সমবায় সমিতি।

তিনি আরো জানান নাগরী ক্রেডিটের জন্য ভিনসেন্ট স্যার প্রচুর সময় দিয়েছেন। শিক্ষকতার পরে নাগরী ছাত্র হোস্টেলের কালেকশান সেন্টারে সদস্য-সদস্যারা শেয়ারে ও সঞ্চয়ে টাকা জমা দিত। আমরা শিমুল গাছের নীচেও কালেকশান করেছি। কালেকশানে থাকতো ভিনসেন্ট স্যার, আমি ও কমিটির সদস্যরা। টাকা ভিনসেন্ট স্যার জমা রাখতেন, পরে পাল পুরোহিতের কাছে জমা রাখা হত। এই ব্যবস্থা ছিল প্রাথমিক পয্যায়ে।
সাক্ষাতকারে এক প্রশ্নের জবাবে মিসেস মেরী রোজারিও জানান বাংলাদেশে ক্রেডিট ইউনিয়ন আন্দোলনের জনক ফাদার চার্লস জে, ইয়াং, সিএসসি ‘র সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে ২০ থেকে ২৫ বার। তিনি কথা শুনতেন বেশী, বলতেন কম, শুধু দরকারী কথা ও নির্দেশনা দিতেন।এছাড়া ভিনসেন্ট রড্রিক্স স্যার সমিতির কাজে আমাকে সব সময় সম্পৃক্ত করতো।
উল্লেখ্য এদেশে ক্রেডিট ইউনিয়ন আন্দোলনের বীজ বপন করেছিলেন ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে ফাদার চার্লস যোশেফ ইয়াং, সিএসসি। ১৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দে ৩ জন ফাদার কানাডায় গিয়েছিলেন, তাঁদের পাঠিয়েছিলেন ঢাকা আর্চডায়োসিস থেকে আর্চবিশপ লরেন্স এল, গ্রেনার, সিএসসি ও  চট্টগ্রাম ডায়োসিস থেকে বিশপ রেমন্ড লারোজ, সিএসসি। ঢাকা আর্চডায়োসিস থেকে আমেরিকান ফাদার চার্লস যোশেফ ইয়াং, সিএসসি ও চট্টগ্রাম ডায়োসিস থেকে কানাডিয়ান ফাদার হেনরী পল ও‘ বে, সিএসসি, ফাদার আন্দ্রে পিকার্ড, সিএসসি, কানাডার এন্টিগনিশে গিয়েছিলেন, তাঁরা ৯ মাস কানাডায় ছিলেন হাতে কলমে ও তাত্বিকভাবে সমবায় বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণের জন্য। সেখান থেকে ১৯৫৪ খ্রীষ্টাব্দে মাঝামাঝিতে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসনে ৩ জন। ফাদার চার্লস যোশেফ ইয়াং, সিএসসি ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে পুরানো ঢাকার লক্ষèীবাজারস্থ সেন্ট গ্রেগরী হাই  স্কুলের হল রুমেদি খ্রীষ্টিয়ান কো অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন অব ঢাকা ( বর্তমান নাম: দি খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড, ঢাকা বা ঢাকা ক্রেডিট নামে সর্বাধিক পরিচিত) গঠন করেন। চট্টগ্রাম ডায়োসিসে ফাদার হেনরী পল ও‘বে, সিএসসি ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দেদি খ্রীষ্টিয়ান ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড, চট্টগ্রাম ধর্মপ্রদেশের চট্টগ্রাম শহরের পাথরঘাটায় (বর্তমান নাম: দি খ্রীষ্টিয়ান কো-অপারেটিভ থ্রিফ্ট এন্ড ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড, চট্টগ্রাম) গঠন করেন। ফাদার আন্দ্রে পিকার্ড, সিএসসি চট্টগ্রাম ধর্মপ্রদেশের অধীন বরিশাল শহরে শিক্ষক সম্মিলনী সঞ্চয় সমিতিটি(গৌরনদী, বরিশাল শহর, নারিকেলবাড়ী, পাদ্রিশিবপুর মিশন স্কুলের সকল ধর্মের শিক্ষক-শিক্ষয়ত্রীদের নিয়ে ১৯৫০ খ্রীষ্টাব্দে গঠিত )  বিলুপ্তি ঘোষণা করে ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে বরিশাল ক্রেডিট ইউনিয়ন গঠন করেন।১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে ফাদার চার্লস যোশেফ ইয়াং, সিএসসি ঢাকা ক্রেডিট গঠন করার পর ক্রেডিট ইউনিয়ন আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে তাঁর সাথে সহযোগিতা করার জন্য অনেকেই তিনি সম্পৃক্ত করেন। তৎমধ্যে নাগরীর নাইট ভিনসেন্ট রড্রিক্স বা ভিনসেন্ট স্যার, বরিশালের চিত্ত রঞ্জন হাওলাদার, খুলনা অঞ্চলের দীনবন্ধু বাড়ৈ অন্যতম।

নাগরী খ্রীষ্টান কো অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান মি: সেন্টু বি গমেজ এর লেখা থেকে আমরা যে তথ্য উপাত্ত পাই
৫০ দশকে এদেশের খ্রীষ্টান পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা তত ভাল ছিল না। বেশীর ভাগ পরিবারই তখন বিদেশী মিশনারী ফাদারদের সাহিয্যের উপর নির্ভর করতো। ১৯৪৬ এর মনান্তরের পর সকল খ্রীষ্টান পরিবারই ছিল আর্থিক টানপোরনে। ১৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দ ও পরবর্তী পয্যায়ে দুর্ভিক্ষ ও দুরবস্থার কথা বয়স্কদের জানা আছে। তখন গরীব, অসচ্ছল খ্রীষ্টান পরিবারগুলোকে সাহায্য করার জন্য প্রতি ধর্মপল্লীকে “ইরমা” নামে বিশেষ ফান্ড বা তহবিল গঠন করা হয়। ঐ ফান্ড থেকে ফাদারেরা গরীবদের সাহায্য করতেন।
এছাড়া ভাওয়াল, আঠারোগ্রাম অঞ্চল, উত্তরবঙ্গে ও বিভিন্ন ধর্মপ্রদেশের প্রতিটি ধর্মপল্লীতে সমবায়ী উদ্যোক্তাদের ফাদার চার্লস জে ইয়াং, সিএসসি তাঁর কাজের সাথে সম্পৃক্ত করেন। তাঁর সহযোগীদের বিভিন্ন এলাকায় পাঠাতেন সভা করার জন্য ও উদ্ভুদ্ধ সমস্যার সমাধান করার জন্য।
ফাদার ইয়াং তাঁর সহকারী নাইট ভিনসেন্ট রড্রিক্স কে সাথে নিয়ে ভাওয়ালসহ দেশের প্রত্যন্ত ধর্মপল্লীতে ভ্রমণ করে সাধারণ খ্রীষ্টভক্তদের ও সমাজ নেতাদের সমবায় ঋণদান গঠনপ্রনালী এবং এর সুফল সম্বন্ধে পরামর্শ ও অনুপ্রেরণা দিতেন। আর তখনই তাঁদের প্রচেষ্টায় অনেক ধর্মপল্লীতে গড়ে উঠে খ্রীষ্টান সমবায় ঋণদান সমিতি।
১৯৬২ খ্রীষ্টাব্দে ফাদার চার্লস জে ইয়াং, সিএসসি ও নাইট ভিনসেন্ট রড্রিক্স এর উদ্দীপনায় গড়ে উঠে নাগরী খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড। প্রথম পয্যায়ে বেশীর ভাগ সদস্যই ছিল মহিলা। উদ্যোক্তাদের পয্যায়ে মহিলারাও এগিয়ে ছিলেন। প্রথম ১৪ সদস্যের কমিটিতে ৫ জনই ছিল মহিলা। সমিতির শুরু থেকে ১৯৬৭ খ্রীষ্টাব্দ দীর্ঘ ৫ বছর সেক্রেটারী পদে ছিলেন একজন মহিলা মিসেস মেরী রোজারিও। বর্তমান ব্যবস্থাপরা কমিটির সেক্রেটারী পদেও আছেন একজন মহিলা মিসেস শর্মিলা রোজারিও, যিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদ অলংকৃত করে আছেন।

১৯৬২ খ্রীষ্টাব্দে ১ম ট্রেজারার মি: আলম আর্নেস্ট ডি‘ কস্তা নাগরী ক্রেডিটের ৫০ বছরের স্বুর্ণ জয়ন্তী স্মরণিকায় স্মৃতিচারণে বলেন
তিনি নাগরী খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের লিঃ ৫০ বছর জুবিলীলগ্নে কাজের স্মৃতিচারণ সহভাগিতা করার আমন্ত্রণে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দবোদ করেন। ২০১২ খ্রীষ্টাব্দে দাঁড়িয়ে ৫০ বছরের পেছনে তাকিয়ে তিনি দেখতে পানছোট সর্ষে দানার মত ছোট বীজ নাগরী খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিঃ,যা নমস্য প্রয়াত ফাদার চার্লস জে. ইয়াং, সিএসসি ও নমস্য ফাদার গেডার্ড, সিএসসি এর অনুপ্রেরণায় শুরু হয়েছিল। মাননীয় ফাদার ইয়াং হলেন দি খ্রীষ্টান কো অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি:, এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে ঢাকা লক্ষীবাজারস্থ সেন্ট গ্রেগরী স্কুল হলে তিনি ক্রেডিট ইউনিয়ন আরম্ভ করেন, তখন আমি ঢাকায় ছিলাম। ফাদারের সাথে অনেক আলাপ-আলোচনা করার সুযোগ হয়েছিল।
এক রবিবার ফাদার গেডার্ড সিএসসি খ্রীষ্টযাগে ঘোষণা করেছিলেন, হাইস্কুল মাঠে মিটিং হবে। ঢাকা থেকে একজন ফাদার আসবেন। তোমরা সবাই উপস্থিত থাকবে। ফাদারের কথায় অনেক ভাই-বোনেরা হাইস্কুল মাঠে মিটিং করার জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন। ফাদার গের্ডাড ও ইয়াং এর অনেক মূল্যবান কথা শুনে সবাই খুব উৎসাহিত হয়েছিল। ফাদার ইয়াং ঐ মিটিং এর সভাপতি ছিলেন। ফাদারের পরিচালনায় ঐ দিনই ১৯৬২ খ্রীষ্টাব্দের ২৮ শে আগস্ট একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং ভোটের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মি: ব্যাপ্টিষ্ট ডি’ কস্তা, ভাইস চেয়ারম্যান মি: মানুয়েল ডি‘ রোজারিও, ম্যানেজার মি: নাইট ভিনসেন্ট রড্রিক্স, ট্রেজারার মি: আলম আর্নেস্ট ডি‘ কস্তা, সেক্রেটারী মিস্ মেরী রোজারিও, সদস্য ৪ জন, যথাক্রমে মি: যোসেফ ডি‘ কস্তা, মিসেস আন্না পালমা, মিসেস পান্তে কুন্তিনা ছেড়াও, মিসেস মার্তিস পালমা। ক্রেডিট কমিটি চেয়ারম্যান মি: লুকাস রড্রিকস্, সেক্রেটারী মি: ভিনসেন্ট রোজারিও, সদস্য মি: ফ্রান্সিস কাঙ্গালী রোজারিও, সুপারভাইজরী কমিটি, সেক্রেটারী মি: জন রড্রিক্স সদস্য মিসেস লুইজা রোজারিও।
তিনি বলেন ক্রেডিট ইউনিয়নের মাধ্যমে আর্থিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এবং সবার প্রতি ভালবাসা ও বিশ্বাসের জন্য এই কার্যক্রমগুলো সুষ্ঠভাবে করতে পেরেছিলেন। নাগরী খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের সূচনা লগ্ন থেকে সুগঠন ও বৃদ্ধির জন্য ওতোপ্রতো ভাবে জড়িত ছিলেন। শিক্ষকতা জীবনের পাশাপাশি যুব সমিতি, বাজার সমিতি, মিশন সমবায় সমিতি, গান বাজনা, নাটক, ক্রীড়া, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার সাথে সাথে নাগরী মিশনবাসীদের কল্যাণের জন্য ইউনিয়নে অনেক আনন্দ নিয়ে শ্রম ও সেবা দিয়েছেন।
নাগরীতে ক্রেডিট ইউনিয়ন শুরু হবার সাথে সাথেই সদস্য-সদস্যারা টাকা পয়সা জমানো শুরু করেন। প্রত্যেক মাসে মাসে টাকা জমা দিতে হত। তিনি বলেন আমার উপর আরোপিত দায়িত্ব আমি সততার সহিত পালন করেছি। ছোট কাল হতেই আমার মনোভব ছিল কি ভাবে মানুষের উপকার করা যায়। ঢাকা থেকে নাগরীতে এসে বিবেকের তাড়নায় আমি সুষ্ঠভাবে আমার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।